রাজধানীর বারিধারায় ফুটপাতে বসে থাকা নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসানকে গাড়িচাপা দিয়ে মৃত্যুর ঘটনায় নিহতের পরিবারের সঙ্গে ৯ লাখ টাকায় আপস হয়েছে বলে দাবি করেছেন এ ঘটনায় আইনের সংস্পর্শে আসা কিশোরের আইনজীবী আলমগীর হোসাইন। তিনি বলেছেন, নিহত ব্যক্তির দাফন-কাফনের জন্য ১ লাখ টাকা এবং তাঁর বৃদ্ধ মা–বাবার ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় আরও ৮ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই আপস হলেই এই ফৌজদারি মামলার কার্যক্রম শেষ হয়ে যাবে কি না, তা নিয়ে আইনি প্রশ্ন রয়েছে।
এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন-অর-রশীদ প্রথম আলোকে বলেছেন, সড়ক পরিবহন আইনে করা মামলা আপসযোগ্য নয়। বাদী ও আসামিপক্ষের মধ্যে আপস হলেও আদালত তা গ্রহণ করতে বাধ্য নন।
গত মঙ্গলবার বিকেলে বারিধারার ডিপ্লোমেটিক জোনের ১ নম্বর সড়কের ফুটপাতে মেহেদী হাসান (২৪) বিশ্রাম নেওয়ার সময় তাঁর ওপর প্রাইভেট কার উঠিয়ে দেওয়া হয়। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। এরপর উপস্থিত লোকজন ওই গাড়িতে কিশোরকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে। রাতে মুচলেকা নিয়ে কিশোরকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। এ ঘটনায় নিহত ব্যক্তির ভাই মুক্তাদীর ইসলাম গুলশান থানায় একটি মামলা করেন। তাতে ওই গাড়ির চালক আকাশ মারককে আসামি করা হয়। সেখানে কিশোরের নাম উল্লেখ ছিল না।
তবে সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়া এ ঘটনার ভিডিও ফুটেজে দুর্ঘটনার পর গাড়ির চালকের আসন থেকে কিশোরকে নামতে দেখার বিষয়টি নিয়ে খবর প্রকাশিত হয়। এরপর বুধবার ওই কিশোরকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। সড়ক পরিবহন আইনে দায়ের করা ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার ওই কিশোরকে ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮–এ হাজির করেন। তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত ওই কিশোরকে গাজীপুরের শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ওই কিশোর ঢাকার গুলশান এলাকার একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ‘ও’ লেভেলের শিক্ষার্থী। বয়স ১৭ বছর। তার বাবা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একজন ক্যাপ্টেন। আর দুর্ঘটনাকবলিত প্রাইভেট কারটি কিশোরের মায়ের নামে নিবন্ধিত।

ওই কিশোরের আইনজীবী আলমগীর হোসাইন। বৃহস্পতিবার ঢাকার আদালত প্রাঙ্গণে
আদালতের আদেশের পর ওই কিশোরের আইনজীবী আলমগীর হোসাইন বলেন, এই মামলায় বাদীপক্ষের সঙ্গে আসামিপক্ষের ৯ লাখ টাকায় আপস হয়েছে। রোববার জামিনের আবেদন করবেন। সেখানে আপসনামা তুলে ধরা হবে।
এ সময় আইনজীবী আলমগীর হোসাইন ওই আপসনামার অনুলিপি দেখিয়েছেন। তাতে প্রথম পক্ষ হিসেবে ওই কিশোরের ভাই এবং দ্বিতীয় পক্ষ হিসেবে নিহত মেহেদীর ভাই মুক্তাদীর ইসলামের নামে স্বাক্ষর রয়েছে। আপসনামায় বলা হয়েছে, ২২ সেপ্টেম্বর বিকেলে বারিধারা ডিপ্লোমেটিক এলাকার ১ নম্বর সড়কে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়িটি ফুটপাতে উঠে গেলে সেখানে বসে থাকা মেহেদী গুরুতর আহত হন এবং পরে মারা যান। আপসনামায় ঘটনাটিকে অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, নিহত ব্যক্তির পরিবারকে ১ লাখ টাকা দাফন-কাফনের জন্য এবং ৮ লাখ টাকা তাঁর বৃদ্ধ মা–বাবার ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মামলাটি প্রত্যাহারে সহযোগিতা করা, অভিযুক্ত কিশোর ও গাড়িচালকের জামিনে আপত্তি না জানানো এবং ভবিষ্যতে এ ঘটনায় আর কোনো অভিযোগ না করার বিষয়েও সমঝোতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
আপস হয়েছে কি না, সে বিষয়ে জানতে নিহত ব্যক্তির ভাই মুক্তাদীর ইসলামের নম্বরে বৃহস্পতিবার বিকেল ও রাতে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি ধরেননি। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গুলশান থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আরেফীন ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আপসের বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আপস হয়ে থাকলেও মামলার তদন্তে তার প্রভাব পড়বে না।’
যা বললেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী
ওই আপসনামার বিষয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন-অর-রশীদ বলেন, আইনে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই যে ওই আপসনামার ভিত্তিতে আদালত ওই কিশোরকে মুক্তি দেবেন। সড়ক পরিবহন আইনের মামলার বিচার হয় মামলার গুণাগুণ, তদন্তকারী কর্মকর্তার প্রতিবেদন এবং সাক্ষ্যের ভিত্তিতে। তিনি বলেন, অনেক সময় দেখা যায় আদালতের বাইরে আসামিপক্ষ বাদীপক্ষকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে লেনদেনের মাধ্যমে মীমাংসার চেষ্টা করে, যা সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত। আইন এ ধরনের আপসকে অনুমোদন করে না। আপসযোগ্য নয়, এমন অপরাধে করা আপস আদালত গ্রহণ করতে বাধ্য নন। ফলে বাদী-বিবাদীর মধ্যে বাইরে যে আপস হয়েছে, তা আইনসিদ্ধ নয়। শুধু আপসনামা দাখিল করলেই আসামি জামিন পাবে বা খালাস পাবে—এমন কোনো সুযোগ নেই।
আইনজীবী হারুন-অর-রশীদ বলেন, থানায় মামলা হলে বাদী শুধু সংবাদদাতা। এরপর মামলাটি রাষ্ট্রপক্ষ বনাম আসামি হয়ে যায়। মামলার তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই বিচার চলবে। বাদী কী বললেন বা আপস করলেন, সেটা আদালত মানতে বাধ্য নয়।
এ ধরনের আপস সমাজ ও আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর শামিল বলে মন্তব্য করেছেন মানবাধিকারকর্মী জিনাত আরা হক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটি যদি আদালত গ্রহণ করেন, তাহলে প্রমাণিত হবে যে টাকা দিয়ে সব করা যায়। অভিযুক্ত ছেলেটি অপ্রাপ্তবয়স্ক। আইনিভাবে তাকে অপরাধী বলছি না, তবে তাকে সংশোধনের পথে আনতে হবে।’
জিনাত আরা হক বলেন, নিহত ব্যক্তির পরিবারের যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য একটি নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়া যায়। কিন্তু তার বিনিময়ে আপস হতে পারে না। এ ধরনের ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিকে সংশোধনের রাস্তায় আনতে হবে, কোনোভাবেই অপরাধকে উৎসাহিত করা যাবে না।
এ দুর্ঘটনায় দায়ের করা মামলার আসামি গাড়িটির চালক আকাশ মারককে (৪৪) বৃহস্পতিবার রাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পুলিশের গুলশান বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ রুহুল কবীর খান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, দুর্ঘটনার সময় গাড়িটির চালকের আসনে ছিল কিশোর। আর পাশে বসা ছিলেন আকাশ মারক। দুর্ঘটনার পেছনে আকাশ মারকের অবহেলা ছিল।