বিশ্বের মোট কার্বন নিঃসরণে নেপালের অবদান খুবই সামান্য। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমালয়ের হিমবাহ ও বরফস্তর দুর্বল হয়ে দেশটিতে একের পর এক ভয়াবহ দুর্যোগ দেখা দিচ্ছে। সাম্প্রতিক প্রাণঘাতী বন্যা, হড়পা বান ও বরফ-পাথরের ধসের পর এবার জলবায়ু ক্ষতিপূরণের দাবিতে সরব হয়েছে নেপাল সরকার।

দেশটির সরকারের বক্তব্য, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তা কোনো করুণা বা দাতব্য অনুদান নয়। বরং দীর্ঘদিন ধরে বিপুল পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী দেশগুলোর ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবেই ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর সহায়তা পাওয়া উচিত।

নেপালে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বরফ-পাথরের ধস এবং লেন্দে নদীর তীরবর্তী তিমুরে ও রসুয়ায় হড়পা বানে ব্যাপক প্রাণহানি ও নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে। ২৬ আগস্টের এই দুর্যোগের পর দেশটিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং ক্ষতিপূরণের বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।

নেপাল মনে করছে, হিমালয় অঞ্চলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও হিমবাহের পরিবর্তনের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। অথচ এসব পরিবর্তনের জন্য নেপালের মতো স্বল্প কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোর দায় তুলনামূলকভাবে কম।

এই প্রেক্ষাপটে কাঠমান্ডু সরকার বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলোর কাছে জলবায়ু ক্ষতিপূরণের দাবি তুলেছে। নেপালের অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের কাছে পাঠানো চিঠিতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশটির ওপর তৈরি হওয়া ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

নেপাল সরকারের যুক্তি, বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বড় অর্থনীতির দেশগুলোর বিপুল গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হয়েছে। এর প্রভাব এখন হিমালয় অঞ্চলের মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতেও পড়ছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর পাশে দাঁড়ানো বড় নিঃসরণকারী দেশগুলোর দায়িত্ব।

জাতিসংঘের জলবায়ু কাঠামোর অধীনে ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ ব্যবস্থার মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সহায়তার বিষয়টি আন্তর্জাতিক আলোচনায় রয়েছে। নেপালও এই কাঠামোর আওতায় ক্ষতিপূরণ ও সহায়তা পাওয়ার দাবি জানাচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির কারণে ঋণগ্রস্ত উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নিজেদের অর্থে দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হলে তা জলবায়ু ন্যায়বিচারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন। নেপালের সাম্প্রতিক দাবি সেই জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্নকেই আরও জোরালোভাবে সামনে এনেছে।

হিমালয় অঞ্চলের মানুষের কার্বন নিঃসরণ তুলনামূলকভাবে কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তাদের জীবন-জীবিকা ও নিরাপত্তাকে ক্রমেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। তাই বৃহৎ কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার দাবি নেপালের জন্য শুধু অর্থনৈতিক সহায়তার বিষয় নয়; এটি বৈশ্বিক জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবিতেও পরিণত হয়েছে।